বাংলাদেশে জুয়া নিয়ে এনজিওর কার্যক্রম
বাংলাদেশে জুয়া একটি বেআইনি কার্যকলাপ হিসেবে বিবেচিত হলেও এর বিস্তার রোধে এবং জুয়ার কুফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে বেশ কয়েকটি এনজিও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এনজিওগুলোর প্রধান লক্ষ্য হলো জুয়ার আসক্তিতে পড়া ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, তরুণদের মধ্যে জুয়ার ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা প্রদান। সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে তারা কমিউনিটি ভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকে।
বাংলাদেশে জুয়া সংক্রান্ত এনজিওগুলোর কাজকে কয়েকটি প্রধান ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়: প্রতিরোধমূলক শিক্ষা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন, গবেষণা ও নীতি প্রণয়নে সহায়তা এবং আইনি সহায়তা প্রদান। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের কাজের বিস্তারিত রয়েছে।
প্রতিরোধমূলক শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম
এনজিওগুলো স্কুল, কলেজ এবং স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারে জুয়ার কুফল নিয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালায়। তারা সেমিনার, ওয়ার্কশপ এবং পথনাটকের মতো বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা ভিত্তিক একটি এনজিও “প্রতিষেধক” গত পাঁচ বছরে ২০০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের কার্যক্রম চালিয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৫০,০০০ শিক্ষার্থীকে সরাসরি রিচ করা সম্ভব হয়েছে। তাদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের সচেতনতা কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে তরুণদের মধ্যে জুয়ার প্রতি আকর্ষণ ৪০% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
এই কার্যক্রমে তারা কীভাবে অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণদের লক্ষ্য করে কাজ করে সে বিষয়েও আলোকপাত করে। তারা ব্যাখ্যা করে যে বাংলাদেশ জুয়া প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে ব্যবহারকারীকে আকর্ষণ করার কৌশল অবলম্বন করে। এই লিঙ্কটি জুয়া প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বোঝার জন্য একটি উদাহরণ সরবরাহ করে: বাংলাদেশ জুয়া।
নিম্নলিখিত সারণিটি একটি এনজিওর বার্ষিক প্রতিরোধমূলক শিক্ষা কার্যক্রমের কিছু প্রধান সূচক দেখাচ্ছে:
| কার্যক্রমের ধরন | বার্ষিক লক্ষ্য (ব্যক্তি) | অর্জন (২০২৩ সাল) | সাফল্যের হার |
|---|---|---|---|
| স্কুল সচেতনতা সেশন | ২০,০০০ | ২২,৫০০ | ১১২.৫% |
| কমিউনিটি ওয়ার্কশপ | ১৫,০০০ | ১৪,২০০ | ৯৪.৭% |
| ইয়ুথ ক্লাব গঠন | ৫০টি | ৫৫টি | ১১০% |
| সচেতনতামূলক উপকরণ বিতরণ | ১,০০,০০০ কপি | ১,১০,০০০ কপি | ১১০% |
কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সেবা
জুয়া আসক্ত ব্যক্তিদের জন্য কাউন্সেলিং সেবা হলো এনজিওগুলোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তারা দেশজুড়ে হেল্পলাইন চালু রেখেছে, যেখানে মানুষ গোপনে পরামর্শ নিতে পারে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে শুধুমাত্র “মানসিক স্বাস্থ্য সেবা” নামক একটি এনজিও তাদের হেল্পলাইনে ১২,০০০টিরও বেশি কল রিসিভ করেছে, যার মধ্যে ৬০% কলের বিষয়বস্তুই ছিল জুয়া আসক্তি সম্পর্কিত।
পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তারা শুধু ব্যক্তিকেই নয়, তার পরিবারকেও কাউন্সেলিং এর আওতায় আনে। আসক্ত ব্যক্তিকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করা হয়। উদাহরণ স্বরূপ, “সমাজ কল্যাণ সংস্থা” নামের একটি সংগঠন জুয়া আসক্তদের জন্য ছোট ছোট উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভোকেশনাল ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, তাদের পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৭০% দুই বছরের মধ্যে জুয়ার সাথে সম্পৃক্ততা প্রায় শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় তারা আসক্তির মাত্রা নির্ধারণ করে থাকে:
- হালকা আসক্তি: সপ্তাহে ১-২ বার জুয়ায় অংশগ্রহণ, আয়ের ১০% এর কম ব্যয়। এই স্তরের জন্য গড়ে ৪-৬টি কাউন্সেলিং সেশন প্রয়োজন হয়।
- মাঝারি আসক্তি: সপ্তাহে ৩-৪ বার অংশগ্রহণ, আয়ের ১০-২৫% ব্যয়। এই স্তরের জন্য ৮-১২ সেশন এবং পরিবারভিত্তিক থেরাপির প্রয়োজন পড়ে।
- তীব্র আসক্তি: প্রায় প্রতিদিন অংশগ্রহণ, আয়ের ২৫% এর বেশি ব্যয়, ঋণগ্রস্ততা। এই ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি (৬ মাস以上) পুনর্বাসন 프로그램 প্রয়োজন।
গবেষণা, আদালতিক সহায়তা ও নীতি প্রণয়ন
বাংলাদেশে জুয়ার বিস্তার এবং তার সামাজিক প্রভাব নিয়ে ডাটা ভিত্তিক গবেষণা পরিচালনা করা এনজিওগুলোর আরেকটি বড় কাজ। তারা জুয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের বয়স, পেশা, আয়, অঞ্চলভিত্তিক প্রবণতা ইত্যাদি নিয়ে সমীক্ষা চালায়। এই গবেষণালব্ধ ফলাফল তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং আইন প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোর সাথে শেয়ার করে, যাতে জুয়া নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে সাহায্য করে।
এছাড়াও, জুয়ার কারণে পারিবারিক সহিংসতা বা আর্থিক কেলেঙ্কারির শিকার ব্যক্তিদের জন্য আইনি সহায়তা প্রদান করে থাকে কিছু এনজিও। তারা আইনজীবীদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ এবং আদালতে মামলা পরিচালনায় সহায়তা করে। গত তিন বছরে শুধুমাত্র “আইন ও সালিশ কেন্দ্র” (আসক) জুয়া সংক্রান্ত ১৫০টিরও বেশি মামলায় আইনি সহায়তা প্রদান করেছে।
এই কাজের চ্যালেঞ্জও অনেক। অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়। তহবিলের অপ্রতুলতা, সামাজিক কুসংস্কার এবং জুয়াকে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে স্বীকার না করার মনোভাব তাদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করে। তারপরেও, এই সংগঠনগুলো স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক নেতাদের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রচেষ্টা শুধু ব্যক্তিকে নয়, সামগ্রিকভাবে সমাজকে জুয়ার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে ভূমিকা রাখছে।